তাওহীদের ব্যখ্যা

তাওহীদের ব্যখ্যা

Tawhid Bekkha

তাওহীদ কিঃ
তাওহীদ অর্থ এক করা, এক বানানো, একএে যুক্ত করা, একএিত করা, একীকরণ(কোন কিছুকে এক করা), একত্বের ঘোষণা দেওয়া বা একত্বে বিশ্বাস করা(to be alone, unique singular, unmatched, without equal, incomparable)।

তাওহীদ শব্দটি আরবি ওয়াহাদা ক্রিয়ামূল থেকে গৃহীত, যার অর্থ এক হওয়া, একক হওয়া বা অতুলনীয় হওয়া। তাওহীদ নামক এ পরিভাষাটি আল্লাহের একত্বে (তাওহিদুল্লাহ) ব্যাপারে ব্যবহৃত হলে তা দ্বারা আল্লাহর সঙ্গে মানুষের সকল প্রকার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ক্রিয়াকলাপ তথা ইবাদতে তার একত্ব উপলদ্ধি করা ও তা নিরবিচ্ছিন্নভাবে অক্ষুণ্ণ রাখা বুঝায়, অর্থাৎ যা কিছু আল্লাহর জন্য সুনির্ধারিত ও সুনির্দিষ্ট সে সব ক্ষেত্রে আল্লাহর একত্ব অক্ষুণ্ণ রাখা।

এই অর্থ তাওহিদুল্লাহর সব কয়টি শ্রেণীকে অন্তর্ভুক্ত করে রাখে । তাওহীদের এই বিশ্বাসটি মূলত এ রকম যে আল্লাহ সুবানাহু অয়া তালা এক তার কর্তৃত্বে ও প্রভুত্বে ( রবুবিয়াত) কোন শরীক বা অংশীদার নেই , তার যাত ও গুণাবলীতে (আসমা অয়া সিফাত) কোনই সদৃশ নেই তথা তিনি একক ও অতুলনীয় এবং ইলাহ রূপে সকল প্রকার ইবাদত পাওয়ার যোগ্য হিসেবে তথা ইলাহ হওয়ার ক্ষেত্রে তার কোন প্রতিদ্বন্দ্বী নেই(উলুহিয়াআত)।
তাওহিদী কালেমার ব্যাখ্যাঃ
আনাস ইবনু মালেক (রাদিয়াল্লাহু আনহু ) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি অয়া সাল্লাম) বলেন যে, “কোন ব্যক্তি যদি এই সাক্ষ্য প্রধান করে যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ বা উপাস্য নেই (অন্য বর্ণনায় আছে যে ব্যাক্তি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলল এবং আল্লাহ ব্যতিত অন্য সব উপাস্য প্রত্যাখ্যান করলো) এবং মুহাম্মদ সা তার বান্দা ও রাসুল তবে তার জন্য আল্লাহ জাহান্নামের আগুন হারাম করে দেবেন।”(মুসলিম আস সহিহ হা ১৬১,৩৮)
আমরা দেখেছি যে, উপরের হাদিসে তাওহীদের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে (লা ইলাহ ইল্লালাহ)আল্লাহ ছাড়া কোন মাবূদ বা উপাস্য নেই। বিভিন্ন বর্ণনায় এর সাথে যুক্ত হয়েছে তিনি একক, তার কোন শরীক নেই। আমরা প্রথমে এ বাক্যটির বিভিন্ন শব্দের অর্থ বুঝার চেষ্টা করব।
আরবিতে (লা) শব্দের অর্থ হল নেই, মোটেও নেই, একেবারে নেই । এই বাক্যে শব্দটি মোটেও নেই, একেবারে নেই অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে ।
(ইলাহ) শব্দের অর্থ হল মাবূদ অর্থাৎ উপাস্য বা পূজ্য, যার কাছে মনের আকুতি পেশ করা হয়, প্রয়োজন মেটানোর জন্য যার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা হয়।

চতুর্থ হিজরি শতকে প্রসিদ্ধ ভাষাবিধ ও অভিধান প্রনেতা আবুল হুসাইন আহমদ ইবনু ফারাসি (৩৯৫হি) বলেনঃ হামযা, লাম ও হা= ইলাহা ধাতুটির একটিই মূল অর্থ তা হল ইবাদত করা। আল্লাহ ইলাহ হবার কারন তিনি মাবূদ বা ইবাদতকৃত।(ইবনু ফারসি, মুজামু মাকাইসুল্লুগাহ ১১২৭)
আরবি ভাষায় সকল পূজিত ব্যক্তি বস্তু বা দ্রব্যকেই ইলাহ বলা হয় । এজন্য সূর্যের আরেক নাম ইলাহাহ কারন কোন কোন সম্প্রদায় সূর্যের পূজা করত (ইবনু ফারসি, মুজামু মাকাইসুল্লুগাহ ১১২৭, রাগিব ইস্পাহানি, আল মুফরাদ পৃ ২১)
মহান আল্লাহ বলেন, ফিরাউন সম্প্রদায়ের প্রধানগন বলল আপনি কি মুসাকে এবং তার সম্প্রদায়কে রাজ্যে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে এবং আপনাকে এবং আপনার উপাস্যদেরকে বর্জন করতে দিবেন? (সুরা ৭ আরাফ, আয়াত ১২৭)
ইবনু আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত যে, তিনি এখানে “আলিহাতাকা ”এর স্থলে “ইলহাতাকা ” পড়তেন। ইলাহাতাকা অর্থ ইবাদত অর্থাৎ আপনি কি তাদেরকে আপনাকে এবং আপনার ইবাদত করা বর্জন করতে দিবেন?(তাবারি, তাফসির জামিউল বয়ান ১৫৪)

এভাবে আমরা দেখছি ইলাহাহ শব্দটি আরবিতে “ইবাদাহ ” শব্দের সমর্থক।(ইবনু মনজুর, লিসানুল আরব ১৩৪৬৮-৪৬৯)
এই ইবাদতবা “ইবাদাহ ” শব্দের অর্থ আমরা বাংলায় সাধারনভাবে উপাসনা বা পূজা বলতে পারি। তবে ইসলামের পরিভাষায় “ইবাদত ” অত্যান্ত ব্যাপক অর্থবহ এবং এর বিভিন্ন প্রকার ও স্তর রয়েছে।

পরবর্তীতে আমরা এ বিষয়ে কিছু আলোচনা করব। আমরা আমাদের আলোচনায় সাধারনভাবে উপাসনা, পূজা ইত্যাদি শব্দের পরিবর্তে “ইবাদাত ” ব্যবহার করব যে,আমরা এই ইসলামী গুরুত্বপূর্ণ শব্দটি সকল অর্থ ও ব্যবহার ভালভাবে বুঝতে পারি।

“ইল্লা ” শব্দের অর্থ ব্যাতিত ছাড়া বা ভিন্ন ।
উপরের আলোচনা থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ” বাক্যটির অর্থ আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই অর্থাৎ যদিও আল্লাহ ছাড়া অন্য অনেক কিছুকেই ইবাদত , উপাসনা, পূজা বা আরাধনা করা হয় তবে সত্যিকারভাবে ইবাদত করার যোগ্য বা মাবূদ হওয়ার অধিকার একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কারোই নেই। আল্লাহই সকল প্রকার ইবাদতের তিনি একমাত্র অধিকারি। ইসলামের পরিভাষায় ইবাদত বলা হয় এমন সব কিছুই একমাত্র তার জন্য।

বিভিন্ন হাদিসে এই বাক্যের যোগ করা হয়েছেঃ “ ওহেদাহু লা শারীকালা হু “। আমরা দেখেছি যে, আরবিতে ওহেদাহু ক্রিয়াপদটির অর্থ এক হওয়া বা অতুলনীয় হওয়া।

(লা) শব্দের অর্থ হল নেই, মোটেও নেই, একেবারে নেই।
“ শরীক ”অর্থ অংশীদার বা সহযোগী। শব্দটি আরবি থেকে বাংলায় প্রবেশ করেছে এবং অংশীদার থেকে শরীক এখন বাংলা ভাষায় অতি পরিচিত শব্দ। আরবিতে “শিরক “ অর্থ অংশীদার হওয়া (to share, participate, be partner, associate) ।

“ইশরাক ” ও “ তাশরীক ” অর্থ অংশীদার করা বা বানানো। সাধারনভাবে শরীক শব্দটিকেও আরবিতে অংশীদার করা বা সহযোগী বানানো অর্থে ব্যবহার করা হয়।(আল ফাইযুমী, আল মিসবাহুল মুনির পৃ ৩১০)
“ লাহু “ অর্থ তার বা তার জন্য ।
এভাবে দেখছি যে, তাওহীদ ঘোষণা বা সাক্ষ্যের এই অংশের অর্থঃ মহান আল্লাহ একক ও অতুলনীয়, তার কোন অংশীদার বা সহযোগী নেই।

This entry was posted in হোম. Bookmark the permalink.